প্রধান সংবাদমুক্তমত

স্মৃতির টানে কিছু কথা- কানিজ কাদীর (২য় পর্ব)

ছোট বেলায় দীর্ঘদিন স্কুল ছুটি পেলে আমি ও আমার বড় ভাই টাঙ্গাইল, আমাদের আমের বাড়ী চলে যেতাম। নানার বাড়ী, দাদার বাড়ী ঘুরে বেড়াতে আমাদের খুবই আনন্দ হতো। আমি আমার দাদার বাড়ীর কিছু মধুর স্মৃতি এখানে তুলে ধরবো।
ময়মনসিংহ থেকে বাসে করে টাঙ্গাইল দাদার বাড়ী যেতাম।
মধুপুরের জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে বাস যেতো। জঙ্গলের বড় বড় গাছ, বানরের লাফালাফি জানালা দিয়ে দেখতাম। খুব মজা পেতাম। তারপর একে একে কালিহাতি, ঘাটাইল পাড়ি দিয়ে বাস আমাদের মোঘলপাড়া নামক জায়গায় নামিয়ে দিত। খুব উচ্ছ্বাস কাজ করতো মনের ভিতর। রাস্তার দুইপাশের ক্ষেত, গাছপালা, ঘরবাড়ী, ব্রীজ পাড়ি দিয়ে দাদার বাড়ী দত্তগ্রাম পৌঁছাতাম। মোঘল পাড়া থেকে কাঁচারাস্তায় হেঁটে হেঁটেই দত্তগ্রাম যেতে হতো। রাস্তাটা ছিল মাটির বেশ প্রশস্থ। রাস্তার পাশে কোথায় স্কুল, কোথায় তালগাছ, কোথায় ব্রীজ, কোথায় চেয়ারম্যান বাড়ী আমার খুব চেনা হয়ে গিয়েছিল। আর এইসব মাটির রাস্তা, গাছপালা, সবুজ ধান ক্ষেত, গ্রামের সব দৃশ্যাবলী আমার মনকে সেই ছোট্ট বেলায় খুব উদ্বেলিত করে তুলতো। আমি অপলক দৃষ্টিতে গ্রামের সব কিছু দেখতাম আর মনের ভেতর প্রচন্ড আনন্দ অনুভব করতাম। আর দাদার বাড়ীতে পৌঁছে গেলে বাড়ীর কোথায় কি আছে সব আমি ঘুরে ঘুরে দেখতাম। বাড়ীর কোথায় মুরগীর খোয়ার, কোথায় লাউয়ের মাচা, সীমের মাচা, কোথায় গরুর গোয়াল, কোথায় রান্নার আলাদা চুলা উঠানের এক কোন কােথায় খড়ের গাদা, আরও অনেক কিছু; কোথায় কোন গাছ, বাবুই পাখীর বাসা, আমগাছ, খেজুর গাছ, বেলগাছ ইত্যাদি
দাদার পাখীর খাঁচায় পাখীর লাফালাফি, পাখিকে গোসল করানো ইত্যাদির প্রতিও আমার আকর্ষণ ছিল। উঠানে মুরগীর বাচ্চাসহ ঘুরে বেড়ানো, হাঁসের প্যাক প্যাক শব্দে পদচারণা, গরুর ঘাস খাওয়া পাখীর কলকাকলী, বাবুই পাখীর বাসা বোনা ইত্যাদি আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতাম। গ্রামের বাড়ীতে আমি বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবন বৈচিত্র খুব সুক্ষভাবে অবলোকন করতাম। গ্রামের শিশুরা কিভাবে পুকুরে গোসল করে, মহিলারা কিভাবে ঢেঁকি পাড় দেয়, চালগুড়া করে, রাখাল কিভাবে গরুর গোয়ালে ঢুকে গরু বের করে, খড় দেয়, ঘাসকাঁটে; মাঝি কিভাবে নৌকা বায়; জেলে কিভাবে মাছ ধরে; চাষী কিভাবে ধান কাটে, পাট কেটে জাগ দেয়, কিভাবে পাটগাছ থেকে পাট কাঠি, পাট বের করে এই দৃশ্যগুলো নিয়ে আমি ভাবতাম, নানা প্রশ্ন আসতো মনের ভেতর। তাছাড়া বর্ষাকালে দাদা যখন আমাদের নৌকায় করে দূরে বিলে বেড়াতে নিয়ে যেতেন, বিলের স্বচ্ছ পানি আমি ছুঁয়ে দেখতাম। শাপলা ফুল ফুঁটে থাকা দেখতাম, শালুকের ছোট ছোট পাতা দেখে খুব আনন্দ পেতাম। আর লগি বেয়ে নৌকার তড়তড় করে বয়ে চলা উপভোগ করতে অনেক আনন্দ পেতাম। আর দাদার বাড়ীর পিছনের ঘন রাঁশঝাড়, আড়ার ভিতরের নানা গাছগাছালির প্রতি ছিল একটা আলাদা আকর্ষণ। বিভিন্ন রকমের গাছ, তেতুল গাছ, গাব গাছ, বেত গাছ, পিতরাজ গাছ আর নাম না জানা নানা ফুল গাছ ইত্যাদির প্রতি আমার পর্যবেক্ষণ ছিল খুবই নিবিড়।

চলবে….

Share this news as a Photo Card

Related Articles

Back to top button
10 June 2026

স্মৃতির টানে কিছু কথা- কানিজ কাদীর (২য় পর্ব)

chitrodesh.com