সাহিত্য

কানিজ কাদীর এর গল্প ‘ফ্ল্যাশ ব্যাক’ (১ম পর্ব)

জনপ্রিয় লেখক কানিজ কাদীর এর বন্ধুত্ব নিয়ে হৃদয় ছোঁয়া গল্প ‌‌’ফ্ল্যাশ ব্যাক’ পড়তে চোখ রাখুন ‘চিত্রদেশ’ এর সাহিত্য পাতায়।

পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার এ ‘ফ্ল্যাশ ব্যাক’ প্রকাশিত হচ্ছে চিত্রদেশ’এ। আজ রইল গল্পটির (১ম পর্ব)

ইউনিট থ্রি-এর অনেক দায়িত্ব শায়রা ম্যাডাম ডা. রেবেকাকে দিয়ে রেখেছেন। হাসপাতালে প্রচুর অপারেশন ছিল আজ। অ্যাডমিশনের দিন। বাসায় আসতে ডা.রেবেকার প্রায় সাড়ে তিনটা বেজে যায়। বাসায় এসে তড়িঘড়ি গোসলটা সেরে নেয় ডা.রেবেকা। ততক্ষণে রহিমা টেবিলে ভাত-তরকারি দিয়ে দিয়েছে। রেবেকা খুব তাড়াতাড়ি জোহরের ফরজটুকু পড়ে নেয়। ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে রেবেকা। ভাবে খেয়ে একটু ঘুমাবে। উঠেই ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিকেলের দিকে একটু বাইরে বেরিয়ে আসবে।ডা.ইয়াসমীনকে বলে রেখেছে ম্যানেজ করার জন্য। ছেলেটা প্রতিদিনই বায়না ধরছে, ‌‌’মা আমার জন্মদিনটা চলে গেল। তুমি তো বলেছিলে এবার জন্মদিনটা মজা করে করবে, কেকের অর্ডার দেবে।’ প্রতি বছর ছেলেটার জন্মদিন আসার আগে কত রুটিন করে রাখে কিন্তু কোনোটাই আর যেন জন্মদিনে করা হয় না শুধু ব্যস্ততার জন্য। সবই করা হয় কিন্তু জন্মদিনের পরে। অন্য একটা দিন ফিক্সড করা হয়। কোনো কোনো সময় সেদিনও মিস হয়। যেমন গত জন্মদিনে সব আয়োজনেই ঠিক ছিল রেবেকার।
কিন্তু রেবেকার মা হঠাৎ করে এত অসুস্থ হয়ে গেলেন যে রেবেকাকে ওনাকে নিয়ে সাত-আট দিন হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে হলো। যাক, পরে ছেলেকে নানা গিফট, চকোলেট ইত্যাদি দিয়ে ভুলিয়ে সেটা পুষিয়ে নিয়েছিল ডা. রেবেকা। নানা কিছু ভাবতে ভাবতে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল রেবেকা। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখ যায় দেয়ালে টানানো বড় করে বাঁধানো স্কুলের বান্ধবীদের নিয়ে তোলা ছবিটির দিকে। ছবিটি বান্ধবীরা নবম শ্রেণীতে থাকাকালীন খুব সখ করে তুলেছিল। কী কোমল চেহারা । যেন কোনো পাপ নেই। কী সরল, স্নিগ্ধ। রেবেকা যতবারই এই ছবিটার দিকে তাকায় একটা ভালোবাসার অনুভূতি ছেয়ে যায় অন্তরজুড়ে । মনে পড়ে যায় সব বান্ধবীর কথা, কত স্মৃতি, কত আবেগ, কত আনন্দ, কত মজা।
আজ ঐসব বান্ধবী কে কােথায়। তারপর আরো কত বান্ধবী জুটেছে, বন্ধু জুটেছে। কর্মক্ষেত্র হয়েছে বিশাল।পরিচিতি বেড়েছে অনেক। নানা কিছু ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শরীরে রেবেকা ঘুমিয়ে পড়ে। প্রায় পৌনে পাচঁটা বাজে। রেবেকার মােবাইল বেজে উঠল। ‘হ্যালো ‘। ও পাশে ডা. ইয়াসমীনের ফোন। আপা একটা আনকন্সাস রোগী এসেছে। খুবই অ্যানামিক (রক্তশূন্যতা)। হিস্ট্রি দেখে মনে হচ্ছে একটোপিক প্রেগনেন্সি। ডা.রেবেকা ভাবল আজো হলো না ছেলেটাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া । রেবেকা ডা.ইয়াসমীনকে বলল, ‘এনেসথেটিস্ট’-কে কল দিয়েছ? ‘ ‌হ্যাঁ আপা, নিলুফার আপাকে আগেই কল দেয়া হয়েছে। উনি এক্ষুনি এসে পড়বেন।’ রেবেকা তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে নিল। রহিমা টেবিলে সেমাই ও চা দিল, চট করে খেয়ে নিল। ড্রাইভার নিচেই ছিল। ছেলেকে ডেকে বলল, ‌‌‌ ‘বাবা আসি, তুমি রেডি হয়ে থেকো, আমি অপারেশনটা সেরেই তোমায় নিয়ে বাইরে যাব।’ আজ চেম্বার নেই।’ না মা আজ হবে না, কাল আমার ম্যাথ ক্লাস টেস্ট আছে।’ আচ্ছা তাহলে কাল বিকেলে নিয়ে যাব।’ ‘ মা কাল বিকেলে বাসায় টিচার আসবে।’ রেবেকা ছেলেকে আদর করে বুঝিয়ে বের হয়ে যায়। অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেই দেখে সবাই রেডি । রেবেকার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল।
এনেসথেটিস্ট ডা.নিলুফার বলল, ‌’আপা, এসে দেখি রোগীটা শক্ এ আছে। অচেতন হয়ে আছে। পালস, ব্লাড প্রেসার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। খুবই এনিমিক। আমি এর মধ্যে দুই ব্যাগ ব্লাড দিয়ে দিয়েছি। এখন একটু ভালো। দুই হাতে চ্যানেল চলছে। আরো রক্তের কথা বলে দিয়েছি।’
ডা. রেবেকা ওয়াশ নিয়ে আসলেন খুব তাড়াতাড়ি। সাহায্য করবে ডা.নাসরিন ও ডা.নায়লা। ডা.নিলুফার জেনারেল এনেসথেসিয়া দিয়েছে। ডা.রেবেকা অপারেশন শুরু করে দিলেন। ডা. নিলুফার ও আরো একজন সাহায্যকারী জুনিয়র এনেসথেটিস্ট রোগী মনিটর করল খুবই সচেতনভাবে। রোগীর জীবন রক্ষা পেল।
রোগী পোস্ট অপারেটিভ রুমে।
ডা.নীলুফার এসে রোগীর পালস্, ব্লাড প্রেসার চেকআপ করলেন। অক্সিজেন সেটুরেশন দেখলেন ।রোগী এখন বেশ ভালো আছে। (চলবে)

 

লেখক: কানিজ কাদীর

আরও

Leave a Reply

Back to top button