স্মৃতির টানে কিছু কথা (৩য় পর্ব)- কানিজ কাদীর
একদিন হেঁটে হেঁটে হাসপাতাল থেকে বাসায় আসছিলাম। দেখি এক বৃদ্ধ লোক নানারকম শস্যদানা, মশলা সাজিয়ে বিক্রি করছে। তার সাজানো ডালায় তিল, তিসি, কালোজিরা ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। সবগুলো জিনিসই বেশ পরিপুষ্ট ও পরিষ্কার মনে হচ্ছিল। অনেকদিন পর তিসি, তিল, কালোজিরা দেখে বেশ খুশী হয়ে গেলাম। আমি অল্প অল্প করে তিসি, কালোজিরা, তিল কিনে নিলাম। ছোটবেলার নানা কথা মনে পড়ে গেল। তিসির লাল লাল চেষ্টা ছোট ছোট দানাগুলো দেখতেও খুব সুন্দর লাগে। এই বীজটি আমি অনেক দিন যাবৎ খুঁজছিলাম। তিসি ভর্তা খুব মজা লাগে। পিয়াজ, রসুন, কাচামরিচের সাথে তিসি ভেজে লবণ মাখিয়ে পাটায় বেটে নিলেই হলো গরম ভাতের সাথে খেতে খুবই মজার। ছোট বেলায় দাদী-নানীর বাড়ী গেলে অনেক খেয়েছি। অনেক সময় তিসি ভেজে রাখলে এমনি এমনি হাতে নিয়েই খেয়েছি।দাদীর কাছে প্রায়ই বায়না করতাম তিসি ভর্তা করে দেবার জন্য। তিল ও কালোজিরা ভর্তাও খেতাম মাঝে মাঝে ।
ছোট বেলায় বিচি জাতীয় জিনিসের প্রতি আমার খুব ঝোঁক ছিল। আমি এই বিচিগুলো সংগ্রহ করে জমাতে বেশ পছন্দ করতাম। দাদীর বাড়ী গেলে আমি বন জঙ্গল থেকে কচ গোটা নামে লাল টুকটুকে মাথায় কাল স্পটের এক ধরণের ছোট গোটা সংগ্রহ করতাম। চন্দন গোটা (লাল চ্যাপ্টা ধরণের) ছিল আমার খুব প্রিয়। পিতরাজ গাছের ফুল থেকে এক ধরণের
লালচে একটু বড় গোটাও অনেক জমাতাম। দাদার বাড়ি গেলে সারাদিন ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে ঘুরে ঘুরে এইসব বিচি আমি সংগ্রহ করতাম। আমার দাদা ছিলেন খুব পরহেজগার মানুষ উনি আমাকে বলতেন “দাদু তোমার চন্দন গোটা গুলা আমারে দিবা আমি দোয়া গোনার কাজে লাগাবো।” আমি দাদার কথা শুনে অনেক অনেক চন্দর গোটা সংগ্রহ করে উনাকে দিয়েছিলাম দাদা খুব খুশী হয়েছিলেন। সবার কাছে বলতেন “আমার নাতনী” দেখ চন্দন গোটা জমাইয়া আমারে দিছে।”
দাদা আমাদের খুব আদর করতেন। আমাদের জন্য মাঝে মাঝে হাট থেকে নানারকম মিষ্টি খাবার, ফল কিনে আনতেন। দাদা হাটে গেলে কখন আসবেন সেই অপেক্ষায় থাকতাম। দাদা বাড়ীর বাইরে থেকে হাকডাক করতে করতে উঠানে ঢুকতেন আর বলতেন-“আমার দাদুরা কই, দেখ তোমাদের জন্য কি নিয়ে আসছি। দাদা সাথে নিয়ে আসতেন বাদামটানা, নই (হলুদ রংয়ের শক্ত মিষ্টি খাবার যা ভেঙ্গে চুষে চুষে খেতে হয়), মোয়া, আনার দানা ফল, বেতগোটা। আনারদানা ফলটি ছিল আমার খুব পছন্দের। এ ফলগুলো আর কখনো খুঁজে পাইনি।
সেই যে দাদার বাড়ীর পিছনে ছিল একটা করমচা গাছ। আমি করমচা পেড়ে খেতাম। ফলটি বেশ টক, তাও খেতাম। গাছটির কাঁটার খোঁচা খেয়েছি অনেক। দাদার বাড়ীর সামনে বেশ বড় একটা বেল গাছ ছিল। দাদী গাছের পাকা বেল পেড়ে শরবত বানিয়ে দিতেন। কাঁচা বেল কেটে শুকিয়ে রাখতেন।কাঁচা বেল পানিতে ভিজিয়ে রেখে পানি খেলে পেট ভাল থাকে।
আর বাড়ির পিছনের জঙ্গলটি ছিল আমার খুব প্রিয়। আমি আড়া ঘুরে ঘুরে নানা জিনিস দেখে অবাক হতাম। বেত গাছ, গাব গাছ, তেতুল গাছ, পিতরাজ গাছ, বাশঝাড়গুলো অবাক বিস্ময়ে দেখতাম। বেশ ঘন গাছগাছালি। নানা রকম পাখীর কিচির মিচির। এবাক হয়ে সব দেখতাম। বেশ কিছু আমগাছ ও কাঁঠাল গাছ ছিল। আমি গাছের তলা থেকে পাকা আম টুকিয়ে এনে দাদীকে কেটে দিতে বলতাম । দাদী কেটে দিতেন। কি মিষ্টি তাজা আম।। দাদী প্রায়ই তেলের পিঠা বানাতেন। আমি চুলার কাছে বসে দাদীর পিঠা বানানো দেখতাম। দাদী পরম গরম পিঠা ভেজে তুলে আমাকে খেতে দিতেন।
দাদার বাড়ীর সামনে ছিল খেঁজুর গাছ। শীতের সকালে গুড় দিয়ে মুড়ি খেতে আর খেজুরের রস খেতে খুব ভাল লাগতো। প্রতিদিন সকালে খেজুরের রসের হাঁড়ি ভরে থাকতো রসে। আর একটা জিনিস ছিল– সেটার কথাও আমার মনে আছে। ‘ছাতু’। যবের ছাতু গুড় পানি দিয়ে গুলে খেতে ভালই লাগতো।
চলবে…



