গল্প-কবিতা

হুমায়ূন কবীর হিমু,র ছোট গল্পঃ Thank Less Job

করিমউল্লাহ,উরফে করিম। সাদাসিধে মানুষ বলতে যা বুঝায় মানুষটি ঠিক তেমন। ডিগ্রী পাস করে কোথায় চাকরি না পেয়ে গত দশ বছর থেকে ঢাকার সাভারের গেন্দায় জেকে গ্রুপে(গার্মেন্টস)কোয়ালিটি ইনচার্জ হিসাবে কর্মরত আছে। কর্ম জীবনে ফাকি কি জিনিস তা জানা নেই করিম সাহেবের। তার অধিনস্থ যারা টেবিল কোয়ালিটি লাইন কোয়ালিটি বা ফিনিসিং কোয়ালিটি হিসাবে যারা কাজ করে তাদের কখনও গালি তো দুরের কথা ধমক দিয়ে কখনও কথা বলে নি। তিনি একটি প্রিন্সিপাল মেনে চলেন আর তা হলে অর্ডার করে নয়,ভালোবেসে মানুষের কাছ থেকে কাজ অনেক সুন্দর ভাবে আদায় করা যায়। তার মনে একটাই কষ্ট, সেটা হচ্ছে কর্ম জীবনের এই দশ বছরে ভালো কাজ করেও কারো ধন্যবাদটুকু তার কপালে জোটে নি। করিম সাহেবের ফ্লোর প্রোডাকশন ম্যানেজার হচ্ছেন (পিএম) হচ্ছেন আরোয়ার সাহেব। পারফেক্ট পিএম বলতে যা বুঝায় তিনি তার চাইতেও দুই হাত লম্বা! মেট্রিক পাশ না করতে পেরে বিশ বছর আগে এই লাইনে প্রবেশ করেন। ফ্লোরের প্রতিটি মানুষ তার ভয়ে আতংকে অস্থির থাকে। মুখ তার পাস করা। এমন কোন বাজে শব্দ নাই যা তার ভান্ডারে নাই। ক্ষেত্র বিশেষে হাত চালাতেও সে ওস্তাদ!
একদিনের ঘটনা। করিম সাহেব ফ্লোরের এক কোনায় বসে আপন মনে ফেব্রিক্স চেক করছেন। কাজ শেষ করে উনি ফ্লোর ঘুরে ঘুরে কোয়ালিটি ম্যানদের খোজ নিচ্ছেন। এমন সময় তিনি দেখতে পেলেন একটি কান ধরে এক পায়ের উপর ভর করে দাড়িয়ে আছে। আর মেয়েটির সামনে একটি চেয়ারে বসে পিএম সাহেব পান খেয়ে মেয়েটির মা মাসি চৌদ্দগুষ্টি তুলে বকছেন।
কি হয়েছে স্যার? আপনি মেয়েটিকে এই ভাবে দাড় করিয়ে রেখেছেন কেনো?
আরে আসেন করিম সাহেব। আমি তো আপনেরেই মনে মনে খুজতাছি। এই দেখেন,আপনের কোয়ালিটি ম্যানের কাজকর্ম!
আচ্ছা স্যার,একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না। আমার জানা মতে এই মেয়েটির বয়সী একটি মেয়ে আপনারও আছে। এই মেয়েটি পেটের দায়ে এখানে কাজ করতে এসেছে। এই মেয়েটির জায়গায় আপনার মেয়েটির কথা একটি বার ভাবেন তো স্যার।
আনোয়ার সাহেব কিছু সময়ের জন্য স্থির হয়ে গেলেন! করিম সাহেবের দিকে স্থির দৃষ্টিতে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেজে তিনি বললেন, করিম সাহেব,এইটা গার্মেন্টস! এইখানে ভদ্র ভাষার কোন খাওন নাই। এইখানে প্রেম প্রীতি ভালোবাসা দিয়া কাম আদায় করন যায় না। এই গুলারে যত পারেন দৌড়ের উপরে রাখবেন। আগামীকাল স্যারেরা আসবেন ইন্সফেকশনে। এই ফেব্রিকটার মতো একটাও ফেব্রিক্স বায়ারদের ধরা খাইলে লগে লগে সিপমেন্ট বাতিল হইবো,এইটা কি মাথায় আছে করিম সাহেব?
আজ পর্যন্ত কি এই ফ্লোরের কোন সিপমেন্ট কেনসেল হইছে স্যার? বায়ারদের পাশে আপনি আমি দুজনই তো থাকি। কখনও দেখি নি আমার এই ফ্লোরে কোয়ালিটি গত কোন কারনে সিপমেন্ট কেনসেল হয়েছে। আপনারা শুধু ফেব্রিক সেলাই করেই খালাস। কিনতু ফেব্রিক্সটির গুণগত মানটি তো আমি সহ আমার এইসব কোয়ালিটি ম্যান ছেলে মেয়েরাই নিশ্চিত করে। সেই সকাল আট টা থেকে রাত আট টা। তারপর আবার রাত বারোটা পর্যন্ত ওভার টাইম। এত পরিশ্রম করার পরেও সিপমেন্ট যখন ওকে হয়,তখন তো সমস্ত কৃতিত্বটা আপনাকেই দেয়া হয় স্যার। বসার’রা হাসতে হাসতে বলেন,আনোয়ার সাহেবের কাজে কখনও খুত দেখলাম না। গার্মেন্টসের ইডি সাহেব আপনাকে প্রতিটি সিপমেন্ট ফাইনাল হওয়ার পর তার রুমে ডেকে নিয়ে পুরস্কৃত করেন। কিনতু একটি বারের জন্যও তো এই আমাদের মতো আমরা যারা কোয়ালিটি ম্যান তাদের কথা ভাবেন না স্যার…
ঐ মিয়া,আপনের বতৃতা থামান। আপনের এই সমস্ত বস্তা পচা ডায়লগ শুনলে গার্মেন্টস চলবো না। আপনের কোয়ালিটি ম্যানদের ভালো কইরা বুঝায় দেন যে,কালকের সিপমেন্ট টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই কথা বলে পিএম সাহেব হনহন করে হেটে গিয়ে তার গ্লাস দিয়ে ঘেরা এসি রুমে ঢুকলেন।
মেয়েটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। করিম সাহেব মেয়েটির মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,মা’রে,কাদিস না। আমাদের জন্মই হচ্ছে আজন্ম পাপ। জন্মে যখন পাপ করেই ফেলেছিস,কষ্ট তো একটু করতেই হবে রে মা।যা,মন দিয়ে কাজ কর। একটা মন খারাপ ভাব নিয়ে করিম সাহেব সামনের দিকে চলে গেলো।
পরের দিন ফ্যাক্টরি পুরাই তোলপার! বায়ার’রা বেশ উত্তেজিত!
এই সব কি ফেব্রিক্স বাবিয়েছেন আনোয়ার সাহেব। দেখেন না আপনি? চোখে কি হোল ঢুকিয়ে রাখেন?
পাশেই আনোয়ার সাবেহের সাথে দাড়িয়ে আছে করিম সাহেব। স্যার আমি কি একটু কথা বলতে পারি?
করিম সাহেবের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বায়ার বললেন,আপনি আবার কি বলতে চান করিম সাহেব?
স্যার,আপনারা ইন্সফেকশন শুরু করা থেকে আমি এখানেই দাড়িয়ে আছি। পাচটি কার্টুনের ফেব্রিক্সের মধ্যে মাত্র তিনটি ফেব্রিক্সে সামান্য অলটার পেয়েছেন,এই জন্য স্যার সিপমেন্ট কেনসেল করাটা কি ঠিক হবে স্যার। আমার দশ বছর কর্ম জীবনে এমনটি কখনও হয় নি স্যার। এবারের মতো ক্ষমা করে দিয়ে সিপমেন্ট ফাইনাল করে দিন স্যার।
আপনার কাছে তো দেখছি আমার নতুন করে কাজ শিখতে হবে করিম সাহেব! আপনার কারনেই এটা হয়েছে। কোয়ালিটি ম্যানদের গালির পরিবর্তে মাথায় হাত দিয়ে আদর করলে তো মালের এই দশাই হবে। ইডি সাহেবকে আমার সালাম দেন আনোয়ার সাহেব।
স্যার,ইডি সাহেব পর্যন্ত যেতে হবে না। আমাকে দুই ঘন্টার সময় দেন,আমি আবার রিচেকের ব্যবস্থা করে আপনার ফেব্রিক্স ঠিক করে দিচ্ছি। ঐ মিয়া,এইখানে খাড়ায়া কি বাল ফালান? যান,ফ্লোরে গিয়া সব কোয়ালিটি লগে আপনিও রিচেক করেন। দুই ঘন্টার মধ্যে আমার সব ঠিক কইরা দিবেন। যান মিয়া..! পিএম আনোয়ার সাহেব করিম সাহেবের দিকে চোখ লাল করে ধমকের স্বরে কথা বকে করিম সাহেবকে ইন্সফিকশন রুম থেকে বের করে দিলো।
করিম সাহেব রুমের বাইরে গিয়ে একটুক্ষণ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে তার ফ্লোরে গিয়ে কোয়ালিটি ম্যানদের নিয়ে কাজে যোগ দিলো। দুই ঘন্টার আগেই কাজ সম্পুর্ন করে আবার বায়ারদের ফেব্রিক্স চেক করার জন্য দেয়া হলো। বায়ার’রা,সিপমেন্ট ফাইনাল করে হাসি মনে চলে গেলো। ইডি সাহেব পিএম আনোয়ার সাহেবকে তার রুমে ডেকে নিয়ে আবার পুরস্কৃত করলো।
বায়ার বা ফ্যাক

লেখক: হুমায়ূন কবীর হিমু

Related Articles

Back to top button