
বলুহরের বাওড়ের এক প্রান্তে সুন্দর ও পরিপাটি গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করে শর্মা পরিবার। পরিবারের কর্তা মদন কুমার শর্মা। তাঁর দুই ছোট ভাই অশোক শর্মা ও বিশ্বনাথ শর্মা। পরিবারের বড় সন্তান মদন কুমার শর্মা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর পড়াশোনা শেষ করে বাড়ির পাশের কোটচাঁদপুর বাজারে পান-সুপারির দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। মিঠা পানের ছিল বিশেষ চাহিদা। বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি জর্দা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে এটি তৈরি করা হতো। ফলে বিকেল থেকেই শর্মার পানের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত।
আশির দশকে মদন কুমার শর্মা ও মিনতী রানির শুভ পরিণয় ঘটে। তাঁদের প্রথম সন্তান কন্যা রূপা শর্মা, দ্বিতীয় সন্তান মহিতোষ কুমার শর্মা এবং তৃতীয় সন্তান মৃন্ময় শর্মা। সন্তানদের বয়সের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। তবে মেজো সন্তান মহিতোষ শর্মা অন্য শিশুদের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তার মধ্যে পশু-পাখির প্রতি বিশেষ ভালোবাসা লক্ষ করা যায়।
বাবা, মা ও ঠাকুরদাদা বিষয়টি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। কোনো পশু বা পাখি দেখলেই মহিতোষ তাকে আদর-ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করত। এরই মধ্যে সে বেশ কয়েকটি বিড়ালছানা ও কুকুরছানা পালন করেছিল। বাড়ির পাশের জঙ্গলে অতিবৃষ্টির কারণে কোনো পাখির ছানা বাসা থেকে পড়ে আহত হলে মহিতোষ সেটিকে পরম যত্নে বাড়িতে নিয়ে আসত। খাঁটি সরিষার তেল ও প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক হিসেবে হলুদ ব্যবহার করে পাখিটিকে সুস্থ করার চেষ্টা করত। অনেক সময় সে নাওয়া-খাওয়াও ভুলে যেত।
পরিবারের সদস্যদের কেউ তার এই পশুপ্রীতিকে ভালোভাবে দেখতেন, আবার কেউ কেউ মৃদু ভর্ৎসনাও করতেন। টিয়া, শালিক ও অন্য পাখির ময়লায় প্রায়ই বারান্দা নোংরা হয়ে থাকত। কিন্তু মহিতোষের মা ছেলের এই বিশেষ ভালোবাসার কথা ভেবে কোনো অভিযোগ না করে সব পরিষ্কার রাখতেন।
কখনো কখনো তার স্কুলের বন্ধুরা দূরের জঙ্গলে গিয়ে বুনো খরগোশ ফাঁদে আটকাত বা পিটিয়ে আহত করত। মহিতোষ অনেক অনুরোধ করে বন্ধুদের কাছ থেকে খরগোশটিকে ছাড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসত। পরে সেবা-শুশ্রূষা করত এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যেত।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই অত্যন্ত চঞ্চল প্রাণী বেজির প্রতিও তার ভালোবাসা জন্মায়। সে বাগানে গিয়ে বেজির থাকার জায়গা খুঁজে বের করত। কখনো গর্ত থেকে বেজির ছানা এনে দুধ খাওয়াত এবং প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করে দিত। এসব কাজে তার এক কাকা বিশেষভাবে সহযোগিতা করতেন।
মহিতোষের দিনগুলো এভাবেই আনন্দে কাটছিল। পশু-পাখিগুলো যেন বনের মায়া ছেড়ে তার ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তারা সব সময় তার কাছাকাছি থাকত। রাত হলে বিড়ালছানা ও বেজির ছানা তার বিছানায় ঘুমাত। শীতের সময় উষ্ণতার জন্য তারা তার কম্বলের ভেতরে আশ্রয় নিত। বাড়ির বারান্দায় টিয়া, শালিক ও ময়নাসহ বিভিন্ন পাখি ছিল। তাদের নিয়মিত খাবার ও পানি দেওয়া, এমনকি প্রয়োজনীয় কীটপতঙ্গ সংগ্রহ করাও ছিল মহিতোষের দৈনন্দিন কাজ। এসব করতে সে ভীষণ আনন্দ পেত। ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যরাও তাকে বাধা দেওয়া বন্ধ করেন এবং সুযোগ হলে সহযোগিতা করতে শুরু করেন।
চলার পথে কোনো নিষ্ঠুর মানুষকে যদি অবলা গরু, মহিষ বা ঘোড়ার ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে বেদম প্রহার করতে দেখত, মহিতোষের হৃদয়ে যেন রক্তক্ষরণ হতো। অল্প বয়সেই সে কোনো কোনো গাড়িয়ালের সঙ্গে প্রতিবাদে জড়িয়ে পড়ত। পরে মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে নিজের পোষ্য প্রাণীগুলোকে আদর-যত্নে সময় দিত।
উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর মহিতোষের মনে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। সে সরকারি ব্রজলাল কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু প্রিয় পশু-পাখিগুলোকে রেখে শহরে থাকতে হবে ভেবে তার মন খুবই ব্যথিত হয়ে পড়ে। তাদের কে দেখবে, কে আদর করবে—এই চিন্তা তাকে কষ্ট দিত। অনেক ভাবনা-চিন্তার পর সে সিদ্ধান্ত নেয়, ভালোবাসার প্রাণীগুলোকে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করে দেবে। তার বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতিতে ফিরে গিয়ে তারা কোনো না কোনোভাবে মানুষের উপকার করবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
উচ্চশিক্ষা শেষ করে মহিতোষ কর্মজীবনে প্রবেশ করে। ।
শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও মহিতোষ তার অন্তরে লুকিয়ে থাকা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কোনো নিষ্ঠুর গাড়িয়ালকে ঘোড়া, গরু বা মহিষকে অমানবিকভাবে প্রহার করতে দেখলে সে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করে। ছাত্র ও পরিচিতজনদের সে বোঝানোর চেষ্টা করে যে পৃথিবীর সব প্রাণীই স্রষ্টার সৃষ্টি এবং প্রত্যেকেরই প্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই পশু-পাখির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ পরিহার করে মানবিক ও সহানুভূতিশীল হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মানুষ যখন অন্য প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ করবে, তখনই এই পৃথিবী আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।




