গল্প-কবিতা

কানিজ কাদীরের গল্প ‘আত্মসম্মান’

রমজান মাস শেষ হতে আর মাত্র ২ দিন বাকি। সামনেই ঈদ-উল-ফিতর। বেশ কিছু কেনাকাটা আগেই করে ফেলেছিলাম। শুধু আমার শাড়ি ও আনুষঙ্গিক কিছু জিনিস কেনার বাকি ছিল। আমি মেয়েকে নিয়েই মাকের্টে গেলাম। শাড়ি ও অন্যান্য জিনিস কিনে বের হলাম। বাসায় ফেরার জন্য আবারো রিকশা খুজঁছিলাম ।একজন রিকশাওয়ালা ডাকল, ‘আসেন, কই যাবেন।’ আমি ওর ডাকার ধরন দেখে ওর রিকশায়ই উঠে বসলাম। মেয়ের সাথে কেনাকাটা ও শাড়ি নিয়ে নানা গল্প করতে করতে যাচ্ছি। এমন সময় রিকশাওয়ালা বলে বসল, ‘আজকে শাড়ি কিনছেন? কত দিয়ে কিনলেন শাড়িটা ? আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তুমি শাড়ির দাম শুনে কি করবে? রিকশাওয়ালা আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে বলল,’না, এমনি জানতে চাইলাম। আমি আমার বউয়ের শাড়ি কিনব তো।’ ‘আমি বললাম, ‘তা, তুমি এখনো বউয়ের শাড়ি কিন নাই? রিকশাওয়ালা বলল,’হ্যাঁ, কিনব, আমি সব সময় ঈদের আগের দিনই শাড়ি কিনি, তখন একটু কম দামে শাড়ি কিনা যায়।’
আমি বললাম,’তুমি কত দামের মধ্যে শাড়ি কিনে দাও তোমার বউকে? রিকশাওয়ালা বলল, ‘শাড়ি তো আমি কিনব না ওই কিনা লইব। আমি সব টাকা তো ওর কাছেই দিয়া দেই।’ আমি ওর কথায় আরো বিস্মিত হলাম। কারণ এই শ্রেণীর লোকরা সাধারণত তো বউকে টাকাপয়সা দিতে চায় না। রিকশাওয়ালা আমাদের সাথে অনেক গল্প করা শুরু করল। আমি ওর কথার ধরণ শুনে বুঝতে পারছিলাম রিকশাওয়ালা অন্য সাধারণ রিকশাওয়ালার মতো না , তার চিন্তা চেতনা একটু ভিন্ন।রিকশাওয়ালা বলছিল, ‘ আমি বরাবরই আমার বউরে টাঙ্গাইলের সুতির শাড়ি কিনা দেই । একটু ভালো দেইখাই কিনে।’ আমি বললাম, ‘তোমার বউ কি করে? রিকশাওয়ালা যোগ করল, ‘না, ওরে কোথাও কাম করতে দেই না। বাচ্চাদের একটু লেখাপড়া শিখাইতেছি তো। ‘ দুইজনই বাইরে থাকলে ওদের দেখবো কে।’ আমি বললাম, ‘তোমার কয় ছেলেমেয়। ও বলল, ‘তিন মেয়ে, কোনো ছেলে নাই। তাতে কি? আইজকাল কি আর কে ছেলে কে মেয়ে এই চিন্তা করলে চলব।’ আমি বললাম, ‘বাহ, তোমার চিন্তা চেতনা তো খুব ভালো । তোমার মেয়েরা কে কী পড়াশোনা করে।’
রিকশাওয়ালা বলল, ‘আমার বড় মেয়ে ক্লাস টেনে পড়ে, মেঝ মেয়ে ক্লাস সেভেনে আর ছোটটা ক্লাস ফোরে পড়ে।’ সে আরো যোগ করল, ‘ছোট মেয়েটারে ওর মা আদর কইরা শার্টপ্যান্ট পরাইয়া রাখে।’ রিকশাওয়ালা বলতে থাকল, ‘আমার ছেলে নাই তা নিয়া আমি চিন্তা করি না। মেয়েদের লেখাপড়া শিখাইয়া বড় করমু। ওরাই আমার ছেলের কাম করবো। ‘
আমি ওর উদার দৃষ্টভঙ্গি ও চিন্তা শক্তি দেখে একটু ভাবলাম, ‘তুমি রিকশা চালাও ক্যান । অন্য কাজ করলেও তো পারো । ‘ সে আমাকে বলল, ‘রিকশা চালাই তাতে কি হইছে। আমি তো আমার রিকশা চালাই। আমি তো পরিশ্রম কইরাই টাকা রোজগার করি।’ আমি বললাম , ‘তোমার রিকশা মানে কি? রিকশাওয়ালা বলল, ‘হ্যাঁ, এই যে রিকশায় উঠছেন, এই রিকশার মালিক আমি। আমি অন্যের রিকশা চালাই না। আমার রিকশারে আমি গাড়ি বলি। দেখেন না আমার গাড়িটা কত নতুন।’ আমি রিকশাটা আবারো দেখলাম। সত্যিই রিকশাটা বেশ নতুন ও মজবুত। আমি ওর আত্মসম্মানবোধ দেখে রিকশা থেকে নামার সময় বললাম ‘তুমি রিকশাওয়ালা হলেও তোমার কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। তুমি তোমার তিন মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছ এজন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। ‘
অক্টোবর,২০১০।

লেখক: কানিজ কাদীর

Related Articles

Back to top button