সাহিত্য

হুমায়ুন কবীর হিমু’র ছোট গল্প ‘মুন্নার দেশপ্রেম’

হুমায়ুন কবীর হিমু

এতো সবুজ হতে পারে আমাদের এই দেশ ! মুন্নার চোখে মুখে শুধুই বিশ্ময় ! ধান ক্ষেতের আইলের উপর বসে মুন্না বাংলার সবুজ মন ভরে উপভোগ করছে।এখনও ধানের শীষ বের হয় নি তাই পুরো মাঠ সবুজে ভরে গেছে।ধান ক্ষেতের ঠিক মাঝখানে একটু ফাকা জায়গা রয়েছে।সেখানে গ্রামের কিছু মানুষ একটি শহীদ মিনার বানিয়েছে।মুন্নার যতদুর চোখ যায় সবুজ ছাড়া আর কিছু চোখে পরে না।এতো সবুজের ভীরে মাঝখানে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলার গর্ব,ভাষা শহীদদের সন্মান জানানোর প্রতীক শহীদ মিনার।মুন্নার মনটা গর্বে ভরে গেলো।মনে মনে যারা এই শহীদ মিনারটি বানিয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো মুন্না।মুন্না যখন দেশ এবং বাংলার রুপে মুগ্ধ,এর মাঝে কখন যে লাবন্য তার পাশে এসে বসেছে মুন্না টের পায় নি।লাবন্যের হাতের স্পর্সে মুন্নার ধ্যান ভাঙ্গে।

তুমি কখন এলে ? এই তো একটু আগে।তুমি এমন কি চিন্তায় মগ্ন ছিলে যে আমি এসেছি অথচ তুমি টের পাও নি ? লাবন্যের চোখে মুখে অভিমানের ছাপ স্পস্ট।লাবন্যর মান ভাঙ্গানোর জন্য মুন্না বলে,”দেখো চারদিকে কত সবুজ।এতো সবুজ তুমি এক সঙ্গে কখনো দেখেছো ? আর এতো সবুজের মাঝে কখনো কি এতো সুন্দর একটি শহীদ মিনার দেখেছো ? দেখো দেখো,সবুজের মাঝে শহীদ মিনারের মাঝের লাল অংশটি মিলে আমার প্রাণের বাংলার জাতীয় পতাকা হয়ে গেছে,দেখো দেখো লাবন্য !!! লাবন্য মুন্নার দেশ প্রেম দেখে অবাক হয়ে যায় ! আরও বেশি অবাক হয়ে যায় সবুজ মাঠের মাঝে শহীদ মিনারের লাল অংশটুকু মিশে বাংলাদেশের জাতীয় পাতাকার আকার ধারন করেছে ! লাবন্য এমন সময় দেখতে পেলো একটি বিশাল আকারের সাপ ধান ক্ষেত থেকে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে ! লাবন্য চিৎকার করে মুন্নাকে ডাকছে কিনতু মুন্নার কানে যেনো কিছুই পৌচছাছে না।মুন্না এক দৃস্টিতে শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে আছে।লাবন্য মুন্নার গায়ে জোড়ে জোড়ে ধাক্কা মারছে……
হঠাৎ মুন্না চোখ মেলে দেখে তার বন্ধু লালন তার গায়ে ধাক্কা মারছে।মুন্না লালনের দিকে চোখ বড় বড় করে কিচছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর সে স্থির হয়।কি রে মুন্না,সেই কখন থেকে তোর গায়ে ধাক্কা মারছি অথচ তোর ঘুম ভাঙ্গার নাম নেই।তোর কাহীনি কি ? আজ যে ১৬-ই ডিসেম্বর সেটা কি তুই ভুলে গেছিস ? কলেজে সবাই রেডি হয়ে আছে শহীদ মিনারে যাবে বলে।সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।অবশেষে মুন্নার ধ্যান ভাঙ্গে।ধরমর করে বিছানা থেকে এক দৌরে বাথরুমে ঢুকে পরে মুন্না।দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন কাজ শেষ করে বাথরুম থেকে বার হয়ে,শার্ট-প্যান্ট পরে,আলমিরা থেকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাটা নিয়ে লালনসহ কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হয় মুন্না।

কলেজে পৌছেই মুন্না পতাকাটি তার দুই বন্ধুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,তোরা দুইজন মিছিলের সামনে পতাকা নিয়ে থাকবি। মুন্না উপস্থিত সবাইকে দুই লাইন করে দাড়াতে বললো।সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ জনের মতো হবে। মুন্না মিছিলে শ্লোগান ধরলো।সে কি শ্লোগান মুন্নার ! মুন্নার শ্লোগানে পুরো কলেজ প্রকম্পিত হয়ে উঠলো ! ৭১-এর হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার।৭১-এ করেছি ক্ষমা,এবার তোদের মারবো বোমা।দেশবাসী হুশিয়ার,দুইটা মন্ত্রি রাজাকার।৭১-আর ২০০০,এক নয়রে রাজাকার।ইত্যাদি শ্লোগান দিতে দিতে মুন্নাদের মিছিল শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে চললো।

হঠাৎ মুন্নাদের মিছিলের সামনে বিকোট শব্দে কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরন হলো।মুহুর্তের মধ্যে মুন্নাদের মিছিল এলোমেলো হয়ে গেলো।মিছিলের কয়েকজন বোমার আঘাতে মাটিতে লটিয়ে পরে কাতরাচেছ।লালন মুন্নার পাশে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পরে আছে।মুন্না নিজেও আঘাত পেয়েছে।মুন্নার আঘাত তেমন গুরতর নয়।মুন্না দেখতে পেলো তাদের কলেজেরই ৭১-এর পরাজিত শক্তি দলের অঙ্গ-সংগঠন নারায়ে তকবীর বলে শ্লোগান দিয়ে মুন্নাদের মিছিলের সামনের দুইজনকে বেদম ভাবে মারছে।মুন্নার বন্ধুদের কাছ থেকে ৭১-এর পরাজিত জানোয়াররা জাতীয় পতাকা কেড়ে নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য ম্যাচের কাঠি জ্বালাচেছ।মুহুর্তের মধ্যেই মুন্নার মাথায় রক্ত উঠে গেলো।কোন মতে সে সোজা হয়ে দারালো।কোন দিকে না তাকিয়ে সে ছুটলো পতাকা লক্ষ করে।মুন্না কোন ভাবেই বাংলা মায়ের অপমান হতে দিবে না।নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে,২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জন করা পতাকার মর্যাদা ক্ষুন্ন হতে দিবে না।মুন্না ছুটছে,কোন দিকে না তাকিয়ে পতাকা লক্ষ করে মুন্না দৌড়াচেছ।কোন ভাবেই বাংলার জাতীয় পতাকায় আগুনের আচঁ লাগতে দিবে না মুন্না।মুন্নার এই দৌড় নিজের জীবন বাচাঁনোর জন্য নয়।মুন্না দৌড়াচেছ বাংলা মায়ের সন্মান রক্ষার জন্য।মুন্না জানে না সে কতো কিলোমিটার স্পিডে দৌড়াচেছ।আমরাও কেউ জানি না।মুন্না কতো কিলোমিটার স্পিডে দৌড়াচেছ,সেটা পরিমাপ করার কোন যন্ত্র কি পৃথিবীতে কেউ আবিস্কার করতে পেরেছে ?????

 

লেখক:

আরও

Leave a Reply

Back to top button