সাহিত্য

বিশ্ব মা দিবস: কানিজ কাদীর

কানিজ কাদীর:

 

আজ বিশ্ব মা দিবস।আমি মনে করি ‘মা’ এই ব্যক্তিত্বটি আমাদের জীবনে জড়িয়ে আছে প্রতিটা দিন। তাই প্রতিটা দিনই ‘মা’ দিবস হওয়া উচিত। তবুও এদিনে ‘মা’র প্রতি একটু বাড়তি শ্রদ্ধা ভালোবাসা যেন সবারই মনে জাগে।
বিশ্বের সমস্ত মাকে জানাই স্বশ্রদ্ধ সালাম। ‘মা’ এই শব্দটি কি মিষ্টি! সন্তান যখন মাকে মা বলে ডাকে কী মিষ্টি, স্নিগ্ধ একটা অনুভূতি জেগে উঠে মায়ের মনে । মা আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।সন্তানের ডাকে, সন্তানের প্রয়োজনে স্বপ্রতিভ ও চঞ্চল হয়ে উঠে। সন্তানের ভালোমন্দ জানার জন্য মায়ের মন সব সময়ই অস্থির থাকে।সন্তানের ভালো খবরে মা যেমন আনন্দিত হয় তেমনি গর্ববোধ করে। সন্তানের মন্দ খবরে মা যে কি কষ্ট পায় সে অনুভূতির ভাগ অন্য কাউকে দেয়া সম্ভব না।
আমার মায়ের বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে।এই বৃদ্ধ বয়সে উনি ওনার মাকে সব সময়ই স্মরণ করেন। সব সময়ই বলেন,’আমার মা ছিলেন একজন মমতাময়ী, স্নেহময়ী,সদালাপী, জ্ঞানী মানুষ।’
প্রায়ই ওনার মা’র কথা বলে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। আম্মা এখন বেশ অসুস্থ। ডায়াবেটিসে একেবারেই কাবু হয়ে পড়েছেন।ভালো করে হাঁটতে পারেন না, হার্টের অবস্থা ভালো না, কিডনিতে সমস্যা, প্রেসার শরীর ব্যথা ইত্যাদি নানা রোগে উনি খুবই কাহিল। ইনসুলিন নিতে হয়, একগাদা ওষুধ খেতে হয় উনারে। কিন্তু এই অসুস্থ শরীরেও উনি সারা দিন ওনার সন্তানদের কথাই চিন্তা করেন।কামনা করেন সন্তানদের সান্নিধ্য।বৃদ্ধ বয়সে মাদের তো একটাই চাওয়া সন্তাদের সান্নিধ্য। সেই সান্নিধ্যটুকু কি আমরা ভালোভাবে দিতে পারি? আমরা সবাই ছুটছি সামনের দিকে পিছনে ফিরে তাকাবার সময় আমাদের নেই।মাঝে মাঝে আমি ভাবি আমার আম্মা আমার জন্য যা করেছেন তার কিছুই আমি করতে পারছি না।আমার মায়ের অনুপ্রেরণা, সাহস, সেবা ও যত্নেই আজ আমি ডাক্তার হতে পেরেছি। আম্মার দিকে তাকালে খুব কষ্ট হয়। কি কষ্টই না করেছেন সন্তানদের জন্য। স্বামী চাকরি উপলক্ষে প্রায়ই ট্যুরে যেতেন। মাসের বেশিরভাগ সময়ই থাকতে হয়েছে বাসার বাইরে।ওই সময়গুলোতে পাঁচটি সন্তানকে নিয়ে কী অবর্ণনীয় কষ্টই না করেছেন। যা শুধু আমরাই অনুভব করতে পারি, অন্য কেউ নয়।
এখন আমিও মা । আমারও বয়স হয়েছে। আমার সমস্ত চিন্তা চেতনা জুড়ে আছে আমার সন্তানরা। ওদের আনন্দ আমাকে সুখ দেয়। ওদের কষ্ট আমাকে বিচলিত করে। সন্তানদের আবেগ, উৎকণ্ঠা আমাকে চিন্তিত করে।আমার শুধু একটাই চাওয়া ওরা যেন সুশিক্ষিত হয়। সুশিক্ষা মানুষকে নম্র, ভদ্র, ও মনুষ্যত্ববোধ শেখায়। সার্টিফিকেটধারী উচ্চশিক্ষার কোনো দাম আছে বলে আমি মনে করি না।ওদের কাছে আমার আর একটি চাওয়া ওদের সান্নিধ্য আর মধুর ব্যবহার।

১০ মে সকালে আম্মাকে নিয়ে বারডেম হাসপাতালে গেলাম চেকআপ করানোর জন্য। এর আগে পপুলার ডায়াগনস্টিক থেকে সব ইনভেসটিগেশন্ করিয়েছি। কালার ডপলার ইকোকার্ডিওগ্রাম করিয়েছি। আম্মাকে হাঁটিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। হাঁটতে পারেন না।হুইল চেয়ারে বসিয়েই সব জায়গায় নিয়ে গেছি। প্রচন্ড গরম পড়েছে, কয়েকদিন রোদও খুব কড়া। আম্মাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে আমিই ঠেলে নিয়ে গেলাম নেফ্রলজি বিভাগে। প্রচন্ড ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে ডাক্তারকে নিজের পরিচয় দিয়ে বেশ আগেই আম্মাকে দেখালাম। একটা ইয়ং ছেলে আম্মার হুইল চেয়ারটা পাহারা দিল। আসার সময় আম্মা ছেলেটির মাথা ছুঁয়ে আদর করে দিল।আমি ছেলেটিকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, ‘আজ মা দিবস, তুমি আমার মা’র অনেক দোয়া পেলে। ‘ আম্মাকে নিয়ে কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্ট এ আসলাম হুইল চেয়ার ঠেলে। সেখানেও অনেক ভীড়। আমার শরীর খুব খারাপ লাগছিল। আম্মাকে নিয়ে একটু পরেই ডাক্তারের রুমে ঢুকলাম। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে বের হলাম। আম্মার হুইল চেয়ার ঠেলে আম্মাকে নিয়ে বের হলাম আর ভাবছিলাম ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আল্লাহ আমাকে ডাক্তার বানিয়েছিলেন বোধহয় ‘মা’ এর এটুকু সেবা করার জন্যই।’

১০ মে, ২০০৯

 

লেখক: কানিজ কাদীর

আরও

Leave a Reply

Back to top button