সাহিত্য

কানিজ কাদীরের গল্প ‘ভালোবাসার নানা রং’

কানিজ কাদীর

সময় ২০১১ সাল। সময়টা সম্ভবত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর হবে। দিনের বেলা বেশ গরম। রাতেও গরম লাগে। ফ্যান বেশ জোরে দিয়েই ঘুমাই। কখনো কখনো এসিও চলে। মাঝে মাঝে শেষ রাতে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা মনে হয়। তখন শরীরে পাতলা কাঁথা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি। আমার বেশ কিছু কাঁথা আছে। যেগুলো বেশ মোটা। সেগুলো গায়ে দিতে খুব একটা ভালো লাগে না। মনে হচ্ছিল পাতলা কাপড় দিয়ে একটা নরম কাঁথা কাউকে দিয়ে যদি বানাতে পারতাম। আমি কাঁথা বানানোর লোক খুঁজছিলাম। অনেককেই বলেছি। কিন্তু কেউ সেরকম সন্ধান দিতে পারেনি। হাসপাতালের আয়া ‘আমাতন’ কে মাঝে মাঝে নানা রকম ওষুধ দিয়ে সাহায্যে করি। একদিন আয়া ‘আমাতন’কে ডেকে বললাম, ‘এই তুমি কি কাঁথা সেলাই করতে পারো।’ ও বলল ‘না আফা, আমি তো পারি না। আমগর এইহানে একটা বেডি আছে সিলাই করে, মেলা দাম নেয়।’ আমি বললাম ‘দামের চিন্তা করছি না। আগে বলো, কাঁথা বানায়ে দিতে পারব কিনা। একটু পাতলা কাঁথা।’ আমাতন বলল, ‘হ’, আফা, আমি খোঁজ নিয়া আইসা আফনেরে বলুম। ’ কয়েক দিন পর আমাতন এসে বলল ‘আফা, খেতা সিলাইয়ের কাপড় লইয়া আইসেন। আমার ডিপার্টমেন্টের পিয়ন রাহেলা কাছেই দাঁড়ানো ছিল। বলল, ‘হ’, আপার খেতাডা সুন্দর কইরা বানায়া দিস।
আমি আমার পুরনো দুইটা শাড়ি ও কাঁথার ভিতরে দেয়ার জন্য একটা পুরনো কাপড় আমাতনকে দিলাম আর সুঁতা কেনার টাকাও দিলাম আর বললাম ‘কাঁথার সেলাইগুলো যেন ভালো করে দেয়।’ আমি কাঁথার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রায় দু সপ্তাহ পরে আমার জন্য তৈরি করা কঁথাটা নিয়ে এলো। ‘আফা, আফনের খেতা আনছি। দ্যাহেন পছন্দ হইল কিনা।’ আমি কাঁথাটা খুলে দেখলাম । কিন্তু কাঁথাটা তো বেশ পুরু হয়ে গেছে। আমি তো হালকা শীতে গায়ে দেয়ার জন্য একটু পাতলা নরম কাঁথা চেয়েছিলাম। রাহেলা বলল ‘না, খেতাটা বেশি ভাল হয় নাই আপা এইডা গায় দিয়া বেশি আরাম পাইব না। ‘
আমাতন বলল, ‘আফা, পাতলা নরম খেতা বানাইলে শাড়ি কিনতে পাওয়া যায়। দুইটা শাড়ি কিন্যা নরম পাতলা খেতা বানাইতে পারবেন।’
আমি বললাম, ‘কাঁথা বানানোর শাড়ি কোথায় পাওয়া যায়। আমাকে না হয় আরেকটা পাতলা কাঁথা বানায়েনই দাও।’ পরদিন আমাতন বলল, ‘আফা ১৫০-২০০ কইরা সুতি শাড়ি পাওয়া যায়। আফনি ট্যাকা দিয়েন। আমি শাড়ি কিন্যা খেতা বানাইয়া আনমুনে।’
আমি আমাতনকে ৪০০ টাকা দিলাম দুইটা শাড়ি কেনার জন্য। বললাম ‘ভালো প্রিন্ট ও সুন্দর রঙের (আকাশি অথবা বেগুনি) শাড়ি কিনবে। আমি দেখলাম রাহেলা আমাতনের সাথে কি যেন বলাবলি করছে।
২-৩দিন পর আমাতন এসে আমার ৪০০ টাকা ফেরত দিয়ে বলল ‘আফা ভালো শাড়ি পাইলাম না, এই লন আফনের ট্যাকা’ আমি বললাম, কি বলো শাড়ি পাইলা না। কি আর বলব ঐ মোটা কাঁথাই গায়ে দিতে হবে।’
বেশ কিছুদিন চলে গেছে। রাহেলা আর আমাতনকে গল্প করতে দেখি মাঝে মাঝে। আমি কাঁথার কথা একদম ভুলেই গেছি।
একদিন সকাল বেলা আমি বেশ আগেই হাসপাতালে এসেছি। এমন সময় রাহেলা আমার দিকে একটা পলিথিন ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আফা, আফনের জন্য একটা জিনিস আনছি। বলেন তো কি?
আমি বললাম, ‘কি আনছো, বুঝতে তো পারছি না।’ রাহেলা আমাকে অবাক করে বের করে দিল বেগুনি কালারের উপর প্রিন্টের শাড়ির একটা পাতলা কাঁথা। আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম। বললাম, ‘তোমরা আমাকে এত ভালোবাস!
আমি কাঁথাটা নিয়ে বাসায় আসলাম। সবাইকে দেখালাম কাঁথাটা। আমি আমার হাজব্যান্ডকে কাঁথাটা দেখালাম। ও বলল, ‘কাঁথাটার প্রিন্ট বেশি ভালো হয়নি। ’ আমি বললাম, ‘না ভালো হলো, আমি এই কাঁথাটাই গায়ে দিব কারণ এতে ভালোবাসার ছোঁয়া আছে।’
আমি এখন প্রতিদিন এ কাঁথাটি গায়ে দেই। খুবই আরামের কাঁথাটা । আমি কাঁথাটার নাম দিয়েছি এসি কাঁথা। আমার এসি কাঁথাটা এখন মাঝে মাঝে আমার হাজব্যান্ডও গায়ে দেয় আর বলে ‘কাঁথাটা সত্যিই তো খুব আরামের।’

লেখক:

 

আরও

Leave a Reply

Back to top button