প্রধান সংবাদবইমেলালেখক পরিচিতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্ষার মেঘ, বৃষ্টির সুর আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক। যে ঋতুকে তিনি তার অসংখ্য কবিতা, গান ও সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন, সেই বর্ষারই এক দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন বিশ্বকবি। আজ ৬ আগস্ট, ২২ শ্রাবণ। বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মনীষীর ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী।

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ (৭ আগস্ট ১৯৪১) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে মৃত্যুর আট দশকেরও বেশি সময় পরও তার সাহিত্য, দর্শন, সংগীত ও মানবিক চেতনা সমানভাবে আলোকিত করে চলেছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে এবং বিশ্বসংস্কৃতিকে।

মাত্র আট বছর বয়সেই লেখালেখির সূচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এরপর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র, শিশুসাহিত্য ও গানের অমূল্য ভাণ্ডারে। দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য সংগীতধারা—রবীন্দ্রসংগীত, যা আজও বাঙালির জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শুধু সাহিত্য নয়, শিক্ষাচিন্তা, সমাজসংস্কার ও মানবকল্যাণেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পথিকৃৎ। শিক্ষাকে প্রকৃতি ও মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করার স্বপ্ন থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন, যা পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে তিনি কৃষিঋণ ব্যবস্থা এবং পল্লি উন্নয়নমূলক নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ।

১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ছিলেন এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। এই অর্জনের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য বিশ্বদরবারে এক নতুন মর্যাদা লাভ করে।

মানবতা ও ন্যায়ের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ কখনো আপস করেননি। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে মানবিক প্রতিবাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১) কলকাতার জোড়াসাঁকোর খ্যাতনামা ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদা সুন্দরী দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ১৪তম। সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বুকে নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করেন। সেই অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর অসংখ্য সাহিত্যকর্মে অমর হয়ে আছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও রবীন্দ্রনাথের গান ছিল সাহস, আশা ও প্রেরণার উৎস। তার রচিত আমার সোনার বাংলা আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। একইভাবে ভারতের জাতীয় সংগীত জন গণ মন-ও তারই সৃষ্টি। বিশ্বের ইতিহাসে দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনন্য সম্মানের অধিকারী।

প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান, কবিতা পাঠ, সংগীতানুষ্ঠান ও নানা আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আজ (৬ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে গীতিনাট্য শ্যামা মঞ্চস্থ করবে ছায়ানট। অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি নন; তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক। সময়ের সীমানা পেরিয়ে তার সৃষ্টি আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে, আর তাই ২২ শ্রাবণ শুধু একজন কবির প্রয়াণের দিন নয়, তার অনন্ত উত্তরাধিকারের সামনে শ্রদ্ধাভরে মাথা নত করারও দিন।

Share this news as a Photo Card

Related Articles

Back to top button
06 August 2026

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী

chitrodesh.com