সাহিত্য

কানিজ কাদীরের এর গল্প ‌‌’পরীর গল্প ও ওরা’

জনপ্রিয় লেখক কানিজ কাদীর এর গল্প ‌‌’পরীর গল্প ও ওরা’ পড়তে চোখ রাখুন ‘চিত্রদেশ’ এর সাহিত্য পাতায়।

পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার ‘পরীর গল্প ও ওরা’ প্রকাশিত হচ্ছে চিত্রদেশে। আজ রইল গল্পটির -১ম পর্ব

অরিত্র ট্রলার নৌকার একেবারে গলুয়ে গিয়ে বসেছে। বিশাল নদী। চারদিকে পানি। নদীর একেবারে মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে নৌকাটা শব্দ করে। পড়ন্ত বেলা। রোদ পড়ে গেছে। আকাশটা এখনো নীল। একটু পরেই সূর্যাস্ত হবে। স্কুল, ক্লাস, কোচিং করতে করতে ক্লান্ত যেন অরিত্র।অরিত্রের খুবই ভালো লাগছে। এত ভালো মনে হয় কখনো লাগেনি। আকাশটা এত ভালো লাগছে ওর। মাঝে মাঝে সাদা মেঘ। দূরে দু-একটা পাখি। নদীর দুপাশে ঘন সবুজ গাছগাছালি মন ছুয়েঁ যাচ্ছিল। এত ঘন সবুজ গাছ ও কখনো দেখেনি। মাঝে মাঝে দু-একটা নৌকা ওদের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। কোথাওবা জেলেরা মাছ ধরছিল। একদম তাজা সব মাছ নড়ছিল। অরিত্রের বাবা ডা.শফিক, চাচা শাহেদ সবাই নৌকাটা থামাতে বলল।অবিশ্বাস্য কম দামে অনেকগুলো মাছ কেনা হলো। নৌকার ছইয়ের ভিতর অরিত্রের মা, আপু,ফুফু বসেছিল। বাবা, চাচা, ফুফা নৌকার ছইয়ের বাইরে চারদিক উপভোগ করছে। এক ফাকেঁ ডা. শামীমা ছই থেকে বের হয়ে এলো। ‘বাহ, খুব সুন্দর তো! এতক্ষণ ভিতরে থেকে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।’ মা শামীমা ক্যামেরা বের করল। সূর্য ডোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আকাশটা লাল হয়ে যাচ্ছে। কি অপূর্ব দৃশ্যের সূচনা হচ্ছে। সূর্যাস্ত নৌকায় বসে দেখা। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ‘মা’ বেশ কয়েকটা ছবি তুলে দিলেন। ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবিগুলো দারুণ এসেছে। নৌকা যাচ্ছে। বাড়ির কাছের ঘাটে আসতে আসতে একেবারে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। অরিত্র ভাবতে লাগল আমার বাবা এতদূর থেকে কিভাবে লেখাপড়া করে বড় হলো । বাবাকে জিজ্ঞেস করল ‘বাবা, তোমরা এখান থেকে কিভাবে লেখাপড়া করেছ।’ বাবা বলল,’এ অনেক স্মৃতি, অনেক কষ্ট করে তবেই আজকে এ পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি। তোমাকে সব পরে বলব।’
রাত হয়ে গেছে। বাড়ির কেয়ারটেকার জয়নাল টর্চ নিয়ে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই মিলে ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিসগুলো নামানো হলো।

কাচা রাস্তা পেরিয়ে ওরা বাড়িতে ঢুকলো। সুরভি হিল জুতা পরে এসেছে। হাটঁতে পারছিল না। চিৎকার শুরু করল। ‘আম্মু ধরো, পড়ে গেলাম। ‘ মা শামীমা বকা দিলেন ‘হিল জুতা পড়ে কেন এসেছো। বলেছিলাম না এত উচু হিলের জুতা পড়ে এসো না। এখন বুঝলে তো। ‘ মা এগিয়ে যেয়ে মেয়েকে ধরল। সবাই মিলে ঘরে ঢুকল। বেশ বড় পাকা ঘর করেছে সুরভির বাবা ও চাচারা মিলে। ঘর তালা দেয়া ছিল। জয়নাল ও ওর বউ অমলা মোটামুটি পরিষ্কার করে রেখেছে। ঘর থেকে একটা সোদাগন্ধ বের হচ্ছে। খাটগুলোতে ধুলো পড়ে আছে। ঘরে একটা স্টিলের আলমারী, কাঠের আলনা, বড় লেপ তোষক রাখার বাক্স, ডাইনিং টেবিলও আছে। জয়নালটা যে কি, আমরা আসব জানে তারপর ও ঘরের জিনিসপত্রে এত ধুলাবালি? মিসেস শামীমা ধুলা মুছে বিছানায় চাদর বালিশ পেতে নিলেন। সবাই হাত মুখ ধোয়ার আয়োজনে ব্যস্ত। মিসেস শামীমা জয়নালের ঘরে যেয়ে মাছগুলো কেটে ফেলতে বলে আমলাকে। কী ভাবে রান্না করবে তারও নির্দেশ দিয়ে এলো অমলাকে। সবাই হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। অরিত্রও হাত মুখ ধুয়ে কাপড়চোপড় বদলে নিল। বারান্দায় চেয়ারে যেয়ে বসল। জোৎস্না রাত। উঠোন ঝকঝক করছে। বাড়ির সামনে এক কোনায় দাদা-দাদীর কবর। অরিত্র দাদাকে দেখেনি। অনেক আগেই মারা গেছেন। দাদীকে দেখেছে। দাদী ওদের ঢাকার বাসায় যখন থাকতেন ও দাদীর বেশ ফুটফরমাস করত। দাদীকে ডেকে ভাত খাওয়াতো। দাদীও ওকে খুব আদর করতেন। দাদা-দাদীর কবর পাশাপাশি দেখে অরিত্রের মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল।
পৃথিবী, মানুষ ও তাদের জীবন নিয়ে ও কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে গেল। এই বাড়িটায় এক সময় কত মানুষ ছিল। এখান থেকেই ওর বাবা, চাচা, ফুফুরা বড় হয়েছে লেখাপড়া শুরু করেছে। অরিত্র ভাবে ‘মানুষ কেমন করে তার মূলেই ফিরে আসে। বাবা ওনার বাবা-মা’র কবর জিয়ারত করতে চলে এসেছেন এত দূরে শুধু তার নিগূঢ় রক্তের বন্ধন ও শিকড়ের টানে। আমি বাবার সন্তান তাই আমিও এসেছি। পৃথিবীর এই নিয়ম। এটা আমাদের মানতে হবে।’ একটু পর বাবাও এসে বারান্দায় বসলেন।

সুরভি মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বলছে। দিন পাল্টেছে এখন। এখন প্রত্যন্ত গ্রামেও ইলেকট্রিসিটি পৌঁছে গেছে মােবাইল নেটওয়ার্ক । অরিত্র বলে, ‘আপু এত মোবাইলে কি কথা বলছো। গ্রামে এসেছ আনন্দ করতে আনন্দ করো। বাবা-মা ডাকল সুরভিকে। ‘এই সুরভি বারান্দায় আসো, দেখ কী সুন্দর চাঁদ , জোৎস্না।’
সুরভি বিরক্তি সুরে জোরে বলল- ‘আমি আসতে পারবো না। আমার ভালো লাগছে না, মাথা ধরেছে।’ মা বললেন-‘এখানে এসে বসো, গল্প করো, ভালো লাগবে।’ এটাই তো তােমাদের শিকড়।এখানে তােমাকে ভালো লাগতেই হবে। বিরক্তি প্রকাশ করলে হবে না।’
একটু পরে দেখা গেলা অনেক বিরক্তি নিয়ে সুরভিও এসে বারান্দায় বসল। চাঁদ দেখে বলে উঠল, ‘ওয়াও! কি সুন্দর চাঁদ।’
নারিকেলের পাতা ঝিরঝির করছে। একটু মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। পরিবেশটাই অন্যরকম লাগছে। সুরভির ভালো লাগছে মা বুঝতে পারল। সুরভির মনের গতি কখন যে কি বোঝা মুশকিল। এই হাসছে, আবার এই বিরক্তি ভালো না লাগা। মা ওর এগুলোর সাথে যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

(চলবে)

লেখক:কানিজ কাদীর

আরও

Leave a Reply

Back to top button