স্মৃতির টানে কিছু কথা (শেষ পর্ব)- কানিজ কাদীর
খেজুর গাছে, তাল গাছে বাবুই পাখীর বাসাগুলো আমি বিস্ময়ের সাথে দেখতাম। কি নিপুন করে ঠোঁট দিয়ে ওরা বাসাগুলো বুনতো। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের বাসা বোনা দেখতাম আর অবাক হতাম। আর একটা জিনিস আমার খুব মনে পড়ে। কাজের মহিলারা যখন ঢেঁকি পাড় দিয়ে চালের গুড়া করতো অথবা অন্যকিছু ভাঙ্গতো আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম আর বলতাম “আমাকে একটু ঢেঁকি পাড় দেয়া শেখাবেন।”
অনেক সময় ঢেঁকিতে পা দিয়ে ছোট ছোট পা দিয়ে ঢেঁকি উঠিয়ে পাড় দিতাম। ওরা আমাকে বলতো “তুমি পারবা না, ছোট মানুষ, পায়ে ব্যথা পাবা।” আরও অনেক স্মৃতি রয়ে গেছে মনের ভেতর
ছোট বেলায় দাদার বাড়িতে গেলে আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব জুটে যেত। তাদের সাথে গল্প, ঘোরাফিরা, খেলাধূলা করে সময় পাড় করতাম।
ওদের অনেকের নাম আমার এখন ভাল করে মনেও নাই। তার মধ্যে ফজু, মোতালেব, খবির, খাইরুল, ইরানী, রহিমা ও আরো কেউ কেউ। সারাদিন পলান পলান, গোল্লাছুট, কুতকুত, আরও নানা খেলায় আমরা মেতে থাকতাম। রহিমা ছিল আমার দাদীর সাহায্যকারীর মেয়ে । কিশোরী বয়সী। ও শাড়ী পরতো। ওর বাবা (অন্ধ) ভিক্ষা করত আর মা কাজ করে সংসার চালাতো। একটা ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। রহিমা আমাকে নিয়ে বিভিন্ন বাড়ীতে, ক্ষেতে ঘুরে বেড়াত। একবার ওর সাথে একটা বাঁশের সাঁকো পাড়’ হওয়ার সময় আমি নীচে পানিতে পড়ে যাই। পানিতে খুব স্রোত ছিল। আমি সাঁতার জানতাম না। পানিতে হামুদুর খাচ্ছিলাম আর চিৎকার করছিলাম। রহিমা তখন বুদ্ধি করে ওর শাড়ীর আঁচল ডিঙ্গিয়ে লম্বা করে আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে, ‘এইটা শক্ত কইরা ধর”। ও তখন শাড়ী টেনে টেনে আমাকে পাড়ের দিকে তুলে নেয়। সে দিন যদি রহিমা আমাকে টেনে না তুলতো আমার জীবনে অন্যরকম ঘটনা ঘটতে পারতো। এটি আমি এখনো মাঝে মাঝে স্মরণ করি।
তবে এখন প্রামের বাড়ীতে গেলে আগের মত আর ভালো লাগে না। সব পাল্টে গেছে। অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। যুগের সাথে প্রযুক্তির নানা উদ্ভাবন এখন গ্রামেও পৌঁছে গেছে। সেই গাছগাছালি, বাড়ীর সেই ঘরবাড়ী, আঁড়া আর আগের মত নেই। আর আমরা সবাই শহুরে বাস্তবতায় এতটাই বন্দী ও ব্যস্ত হয়ে গেছি যে দেশের বাড়িতে যাওয়ার সময়ই যেন হয়না। তাই অন্তরে নিজ জন্মস্থানের প্রতি এত টান থাকলেও সেই ভাবে মাতৃভূমিকে সংরক্ষণ করার উদযোগ আমরা নিতে পারছি কি?
(শেষ)



