প্রধান সংবাদ

কেরানীগঞ্জে কারখানার আগুনে নিহত বেড়ে ৬

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোলচত্বর এলাকার গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় লাগা আগুনে পুড়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়িয়েছে। তবে মারা যাওয়া কারোরই নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

শনিবার (৪ এপ্রিল) রাতে ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহগুলো নারী নাকি পুরুষ বোঝা যাচ্ছে না। অনুসন্ধান চলছে।

শনিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের আমবাগিচা বাজার রোড এলাকায় ‘এস আর গ্যাস প্রো লাইটার’ কারখানায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে কারখানার ভেতরে অনুসন্ধান চালিয়ে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এদিকে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দেন তিনি।

জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬ জনের সবাই ওই কারখানার শ্রমিক।

এ ঘটনায় এক নারী ও দুই পুরুষসহ তিন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া নাঈম নামে ১৩ বছরের এক শ্রমিকসহ ৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, গতকাল সকালে প্রতিদিনের মতো কারখানার শ্রমিকরা কাজ শুরু করেন। দুপুর পৌনে একটার দিকে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সেখানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটিতে গ্যাস লাইটার তৈরি করা হচ্ছিল। এর আগেও একই কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের পর পর স্থানীয়রা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে খবর দিলে কেরানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরসহ আশপাশের আরও ৫টি ইউনিট এসে আগুন নেভাতে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর কারখানার ভেতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। এতে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারখানায় দেড় শতাধিক শ্রমিক কাজ করতেন বলে স্থানীয়রা জানান। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে স্থানীয়রা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। তবে কী কারণে এ আগুনের সূত্রপাত তা জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, কারখানাটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর একই কারখানায় আগুন লেগে কয়েকজন আহত হয়েছিলেন। তখন এলাকাবাসী প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন আবাসিক এলাকা থেকে এই কারখানা সরিয়ে ফেলার জন্য। তখন এই কারখানায় পর্যাপ্ত আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না। এ বছর আবার একই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের প্রাণহানি হলো।

কারখানাটির জমির মালিক আকরাম হোসেন। তার ছেলে আখতার হোসেন গ্যাস লাইটার কারখানাটি মালিক হিসেবে পরিচালনা করে আসছেন। কারখানায় দেড় শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। ঈদের ছুটিতে পুরোদমে কারখানাটি চালু না হওয়ায় শনিবার ৩৫ থেকে ৪০ জন শ্রমিক কাজে ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে কারখানার মালিক পলাতক।

ফায়ার সার্ভিসের জোন কমান্ডার (ঢাকা দক্ষিণ), ফয়সালুর রহমান জানান, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে প্রথমে দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে আগুনের তীব্রতার জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে আরও পাঁচটি ইউনিট কাজ শুরু করে। প্রায় ২ ঘণ্টা চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণের পর কারখানা ভেতরে খোঁজাখুঁজি করে মোট পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের অবস্থা এতটাই বীভৎস যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তাদের পরিচয় শনাক্ত করা অসম্ভব। মৃতদেহগুলো স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড) মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন নিখোঁজ শ্রমিক নাঈমের মা কুলসুম বেগম। তিনি বলেন, তিন মাস আগে ছেলে এ কারখানায় কাজে ঢোকে। আজ সকাল আটটার দিকে কাজের উদ্দেশে ছেলে বের হয়। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ নেই। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই।’

কুলসুম বেগমের মতো সন্তানের জন্য কারখানার সামনে অপেক্ষা করছিলেন কাওসার সরদার নামের এক ব্যক্তি। তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে মনিরাও এই কারখানায় কাজ করে। কাওসার সরদার বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে আমার মেয়ে কারখানাটিতে কাজ করছিল। প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও সে কাজে যায়। পরে লোকমুখে জানতে পারি এখানে আগুন লেগেছে। পরে এখানে ছুটে এসে মেয়ের খোঁজ করছি। কিন্তু মেয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।’

সরেজমিন দেখা যায়, পোড়া কারখানার ভেতর থেকে একে একে পাঁচটি ও পরে আরেকটি মৃতদেহ উদ্ধার করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। পরে মৃতদেহগুলো পুলিশের পিকআপভ্যানে রাখা হয়। এরপর লাশগুলো ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সযোগে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে মৃত ব্যক্তিদের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি। আগুনে পুড়ে যাওয়ায় মৃত ব্যক্তিরা পুরুষ না নারী, সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।

Share this news as a Photo Card

Related Articles

Back to top button
05 April 2026

কেরানীগঞ্জে কারখানার আগুনে নিহত বেড়ে ৬

chitrodesh.com