সাক্ষাৎকার

গ্যাস-বিদ্যুতের চোরাই লাইন বন্ধ করে শিল্পে দেওয়া হোক :সুমন

স্টাফ রিপোর্টার:
মাহমুদুর রহমান সুমন একজন উদীয়মান ও তরুণ উদ্যোক্তা। পিপি ওভেন ব্যগ, বস্ত্র খাতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা করছেন। দেশের অর্থনীতিতে অবদার রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরিতেও কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে তিনি গ্রিস-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন। একইসঙ্গে তিনি চায়না-বাংলাদেশ চেম্বারের পরিচালকও। সম্প্রতি ব্যবসা বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা ও আগামী দিনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন তিনি। মাসুদ বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করে দেশের জনগোষ্ঠিকে কাজে লাগাতে পারল এক অপার সম্ভাবনাময় দেশ হতে পারে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশি বিনিয়োগের পথ ধরে আসতে পারে বিদেশি বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মাহমুদুর রহমান সুমনঃ বিশ্বের যতগুলো সম্ভাবনাময় দেশ আছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। বাংলাদেশের সুবিধাগুলোর অন্যতম হলো ডেমোগ্রাফিক্যাল ডিভিডেন্ড। শস্তা শ্রমের ফলে আমাদের বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনেক। তবে যে পরিমাণে সম্ভাবনা আছে, সে হারে বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশী বিনিয়োগ না থাকার ফলে বিদেশী বিনিয়োগও আমরা পাচ্ছি না। কারণ হলো সব সময় বিদেশীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সে দেশের বিনিয়োগের অবস্থা দেখে। মূল কথা হলো দেশী বিনিয়োগের পথ ধরেই বিদেশী বিনিয়োগ আসবে।

অন্যদিকে আমাদের সম্পদ সীমিত। তবে যে সম্পদ আছে, সেটি দিয়েই অনেক কিছু করা যেতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, অবকাঠানো সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে আমরা সেটি করতে পারছি না। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যে দেখা দিচ্ছে মন্দাভাব।

আপনি বলছেন বিনিয়োগ অবস্থা ভালো না। তার পরও সরকার ১০০ অর্থনৈতিক জোন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এটি আপনি কিভাবে দেখছেন।

মাহমুদুর রহমান সুমনঃ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো (এসইজেড) অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে এর বিকল্প নেই। বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমাদের ব্যবসা করতে হয়। ব্যবসার জন্য অন্য দেশের উদ্যোক্তারা যে সুবিধা পায়, সে তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। অথচ তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমরা ব্যবসা করছি। আমাদের পোর্টের সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যাসহ ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যান্য সুবিধা একত্রে পেতে হলে এসইজেডের বিকল্প নেই। এখানে কোন ধরণের ঝামেলা ছাড়াই সব সুবিধা পাওয়া যায়।

আমাদের দেশের বিনিয়োগ মন্দার কারণগুলো কী কী?

মাহমুদুর রহমান সুমনঃ সারা বিশ্বে বিনিয়োগের মন্দা সময় পার করছে। আমরাও এর বাহিরে না। এক সময় গার্মেন্টস শিল্পে আমরা দ্বিতীয় নাম্বার ছিলাম। তার থেকে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এর কারণ হলো আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো এর জন্য যে হারে প্রণোদনা দিচ্ছে, সে হারে আমরা পাচ্ছি না। যেমন ভারত ২০১৮ সালে এ খাতে লিড নিতে চাচ্ছে। এর জন্য তারা মিশেনারিজ আমদানীর জন্য ২৫ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। এর বাহিরে তারা ইনসেটিভ দিচ্ছি, ব্যবসার জন্য সুন্দর করে অবকাঠামো করে দিচ্ছে। সেই দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে। উল্টো দিনে দিনে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা বাড়ছে। গ্যাস থাকলেও তেমন প্রেসার নেই, প্রতি বছর গ্যাসের দাম বাড়ছে, ট্রান্সপোর্ট খরচ বাড়ছে- এগুলো আমাদের জন্য বড় ধাক্কা।একদিকে লাখ অবৈধ সংযোগ, সিস্টেমস লস, অন্যদিকে দর বৃদ্ধি। এর সমাধান না করে সরকার ব্যবসায়ীদের উপর চাপাচ্ছে। সরকারের উচিত এ সব বিষয়ে নজর দিয়ে সমস্যার সমাধান করে ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেওয়া।

বস্ত্র খাতের সার্বিক অবস্থা কী?

মাহমুদুর রহমান সুমনঃ এক সময় কৃষি নির্ভর দেশ ছিলো বাংলাদেশ। এখন দিনে দিনে এটি বদলাচ্ছে। কৃষির পরীবর্তে শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে দেশ। বিশ্বের একমাত্র ব্যবসা হলো বস্ত্র খাত। সেখানে এক মিলিয়ন ডলারে ২৫০ জন লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। যদি প্রতি বছর বস্ত্র খাতের ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলে ৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। কম বিনিয়োগে এতো লোকের কর্মসংস্থান অন্য খাত দিয়ে সম্ভব নয়। আর এর পুরো অংশটাই হলো বৈদেশিক মুদ্রা। এই টাকাগুলো যাদের মাধ্যমে আসে তাদের অধিকাংশ শ্রমিক অন্য কাজের উপযোগী না। ফলে এর মাধ্যমে দেশের বস্ত্রের চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানি করে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। সব মিলিয়ে সারা বিশ্বে এখাতের ব্যাপক অবস্থান তৈরি হয়েছে।

২০০২ সালে আমেরিকায় গিয়েছিলাম, আসার সময় বন্ধুবান্ধবদের জন্য কিছু কাপড় কিনতে গিয়ে দেখি ৯০ শতাংশ পণ্যে মেড ইন বাংলাদেশ লিখা। বিষয়টি দেখে অনেক ভালো লেগেছে। তখন আমেরিকায় আমাদের অবস্থান ছিলো দ্বিতীয়। কিছু দিন আগে একটি দোকানে ২০-৩০ শতাংশ পণ্য পেয়েছি মেড ইন বাংলাদেশ নামে। সেখানে আমাদের অবস্থা আগের মত আর নেই। এখন আমরা আমেরিকায় ৪ বা ৫ নাম্বারে চলে গেছি। এটি আমাদের জন্য ভালো খবর না। তবে বিশ্বে আমাদের বস্ত্র নিয়ে একটি সুনাম আছে। এই সুনামকে কাজে লাগাতে পারলে, আর সরকারের সহযোগিতা পেলে আগের গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বস্ত্র খাতে আমাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চায়না। ওদের সরকার অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়, যা আমরা পাই না, তার পরও আমরা ওদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছি।

ভারত, শ্রীলংকাসহ ১২২টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। জিএসপি সুবিধা ছাড়া তাদের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করছি। অবশ্যই এটি আমাদের জন্য অনেক কঠিন। আমাদের দেশে কিন্তু উৎপাদন খরচ কম নয়। সবাই খরচ কমানোর চেষ্টা করছে। আমাদের দেশে প্রতি দিনেই খরচ বাড়ছে। গার্মেন্টস খাত একটি বাচ্চার মত। এটি নার্সিং করতে হবে। আর করতে না পারলে আমাদের যে সম্ভাবনা সেটি কাজে লাগাতে পারবো না। এটি আরও শক্তিশালী করতে হলে সরকারের সহযোগিতার বিকল্প নেই।

আপনি গ্যাস-বিদ্যুতের কথা বলছিলেন। এর সমাধানের জন্য কী করা যেতে পারে?

মাহমুদুর রহমান সুমনঃ গ্যাসের সরবরাহে গতি না থাকায় ৩০-৪০ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা কম হচ্ছে। আমি মনে করি এর অন্যতম কারণ হলো চোরাই লাইন। চোরাই লাইনের কারণে তেমন লোড পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে লোড না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর রুগ্ন হচ্ছে। অন্যদিকে দর বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনে খরচ বাড়ছে। আরেকটি হলো শত শত জেনারেটর ইম্পোর্ট হয়ে পড়ে আছে, গ্যাসের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। এই বিষয়টির সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও প্রয়োজন আছে বলে আমি করি।

আরেকটি সমস্যা হলো গ্যাসের নতুন কোনো সংযোগ দিচ্ছে না। ফলে মালিকরা কারখানা করেও উৎপাদনে যেতে পারছে না। বিনিয়োগ বা শিল্পায়ন চাইলে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ দিতে হবে। এটি বড় সমস্যা। চোরাই লাইনগুলো বন্ধ করে শিল্পায়নের জন্য ব্যবহার করার সুযোগ দিতে পারে সরকার।

চিত্রদেশ ডটকম//এলএইচ//

আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button