সাহিত্য

কানিজ কাদীরের গল্প ‘এমনও তো হতে পারে’ (২য় পর্ব)

কানিজ কাদীরের গল্প ‘এমনও তো হতে পারে’ পড়তে চোখ রাখুন ‘চিত্রদেশ’ এর সাহিত্য পাতায়।

পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে চিত্রদেশে। আজ রইল গল্পটির -( ২য় পর্ব)

দুপুরে খেয়ে শোভন কখনোই বিছানায় শুতে চায় না। মা বকা দেন ‘একটু ঘুমিয়ে নিলেও তো পারো। না ঘুমাও তো শুয়ে একটু বিশ্রাম নাও। না শোভন ঘুমাবে না। কুটকুট করে কাগজ কেটে এটা বানাবে ওটা বানাবে। টেলিভিশনে কার্টুন দেখবে। কার্টুন শােভনের খুব পছন্দ। আজ শোভন মাকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘মা, ওরা কি টেলিভিশন দেখে না।’ মা বলেন-‘দেখে হয়তো রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে কোনো দোকানে । তোমার মতো করে ঘরে বসে কি আর দেখতে পারে।’ মা খেয়াল করছে ইদানিং রাস্তার ওই ছেলেটার ব্যাপারে শোভনের জানার আগ্রহ খুব বেশি। মাকে নানারকম প্রশ্নবানে জর্জরিত করছে সে।
স্কুলে যাওয়ার পথে প্রতিদিন দেখে ওর বয়সী ছেলেটাকে। সিগনালের জ্যামে আজো লাল গোলাপ বিক্রি করছে। আজ আবার সাথে দেখে ছোট্ট একটি মেয়ে। মাথায় কোকড়া চুল । চোখ দুটি বড় বড় । মায়াভরা, পরনে শুধু একটা হাফপ্যান্ট। খালি গা।দেখতে ভারী মিষ্টি। ছেলেটির পরনে আজো ময়লা কাপড়চোপড়। ছেলেটি শোভনের গাড়ির কাছে এসে হাত দিয়ে বলল- ‘খালাম্মা ফুল নিবেন। মাত্র বিশ টাকা।’ আতিয়া তাহিরা গাড়িতে ফকিররা টোকা দিলে ভীষণ রেগে যায়।অনেক সময় ফকিরকে বেশ বকাও দেয়। কিন্তু আজ কিছু মনে করল না। কাচ নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই ছ্যামড়া এই বয়সে রাস্তায় ফুল বিক্রি করিস ক্যান? অন্যকোনো কাজ করতে পারিস না। আমরা বাসায় মানুষ পাই না। চল আমার সাথে। ‘মিসেস আতিয়া জানে এরকম কথা বললে বাচ্চা ছেলেপেলেরা যারা রাস্তায় ভিক্ষা করে দৌঁড়ে পালায়। ওরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করবে।পড়ালেখা নেই। স্বাধীন জীবন। ওদের দেখারও কেউ নেই। কারো মা নেই, কারো বা বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে করেছে, কারো বা বাবা-মা কারোরই খবর নেই। কারাে বা বাবা-মা অসুস্থ। তাই ওরা এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে যায়।বন্দী জিবন ওদের ভালো লাগে না। ওদের সঠিক দিক-নির্দেশনা দিলে ওরা হয়তো ভালো দিকটাই বেছে নিত।আতিয়ার কথায় ছেলেটি একটু রেগে গেল, ‘ফুল বিক্রি না করলে চলমু কেমনে। দেখতাছেন না লগে ছোট বইন আছে।’ বলেই ছেলেটি রাগ করে বোনটিকে নিয়ে সরে পড়ল। শোভন মাকে বলল, ‘মা, ও এরকম রাগ করে উঠল কেন? মা দেখেছ ছেলেটাকে দেখে কেমন যেন মায়া লাগছে? মা বলল, ‘ওর রাগের অনেক কারণ থাকতে পারে।’ এটা ওর স্বাধীন জীবন। এখানে আমি এভাবে বলেছি তাই হয়তো রাগ করেছে।’ শোভন বলে, ‘মা, ওযে রেগে গেল তাও ওর জন্য আমার খারাপ লাগছে।’ মা বললেন , ‘ও তো একটা কাজ করে পয়সা রোজগার করছে। ওর বয়সী ছেলেপেলেরা অনেকেই তো রাস্তায় ভিক্ষা করে দেখ না। ওদেরকে বাসায় কাজ করতে বললে ওরা ভয় পেয়ে যায়। সবাই স্বাধীন জীবন চায়।’ মা ছেলেটাকে দেখে তো ভিক্ষুক মনে হয় না। নিশ্চয়ই ওর ফ্যামিলিতে কোনো সমস্যা আছে। মা ওকে কাল পেলে জিজ্ঞেস করব ওর কি সমস্যা।’ বড় ছেলে শাওনের উচ্চাভিলাসী চিন্তা ভাবনা আতিয়া তাহিরাকে যেমন ভাবায় ছোট ছেলে শােভনের এ ধরনের অন্যদের নিয়ে ভাবনাটাও বেশ ভাবিয়ে তোলে। শোভন ছোট হয়েও ভাইয়ার মতো অযাচিত বায়না ধরে না। জামাকাপড়ের জন্যও তার অতিরিক্ত আবদার নেই। বাসার বুয়ার ওর সমবয়সী ছেলেটাকে নিয়েও ওর বায়না। ওর সব পুরনো বই, খাতা বুয়ার ছেলেকে দিয়ে দেয়। শার্ট, প্যান্ট একটু পুরনো হলেই বুয়ার ছেলের জন্য রেখে দেয়। ঈদ আসলেই মা’র কাছে বায়না ধরে নিজের কাপড় চোপড় কেনার সাথে সাথে বুয়ার ছেলের জন্য একটা শার্ট তার কেনা চাই-ই। বুয়াটা কষ্ট হলেও ছেলেকে স্কুলে দিয়েছে। স্বামী রিকশা চালায়। দুজন মিলে যা কামাই করে তা দিয়ে ঘরভাড়া দেয় আর সংসার চালায়। এর মধ্যেও ছেলেকে স্কুলে দিয়েছে। ক্লাস সিক্সে পড়ে। শোভনের চেয়ে এক ক্লাস নিচে। বুয়াকে মিসেস আতিয়া প্রতিবারই বছরের পয়লা কিছু টাকা দেয় ছেলের বই কেনার জন্য । বুয়া লাইলী এই অপেক্ষায়ই থাকে প্রতি বছর। খালাম্মা যদি টাকা না দেয় ছেলের বই কেনা খুবই সমস্যায়ই পড়ে যাবে। মিসেস আতিয়া মাঝে মাঝে ভাবে সমাজের বিত্তবান লোকেরা সবাই যদি একটা করে শিশুর পড়ালেখার দায়িত্ব নিত তাহলে কিছু শিশু হয়তো লেখাপড়া করার সুযোগ পেত।(চলবে)

লেখক: কানিজ কাদীর

 

বই:’টুকরো কথা’

আরও

Leave a Reply

Back to top button